Social Icons

Join Our Facebook Fan Page

Monday, February 18, 2013

শাহবাগ, বাংলাদেশ

শাহবাগ ঢাকার নওয়াবদের বাগানবাড়ি। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্র, কলাভবন ও জাতিয় জাদুঘর সংলগ্ন এলাকা নিয়ে বিস্তৃত ছিল এই বাগানবাড়ি। মুগল আমলে বর্তমান হাইকোর্ট ও শিশু একাডেমী এলাকায় ছিল বাগ-ই-বাদশাহি এবং বর্তমান বাংলা একাডেমী ও টি. এস. সি এলাকায় ছিল সুজাতপুর আবাসিক অঞ্চল। সুজাতপুরের উত্তরে পরবর্তী সময়ে নুরুদ্দিন হোসেন কর্তৃক স্থাপিত হয়েছিল নূর খান বাজার। বাগ-ই-বাদশাহি ও সুজাতপুরের মাঝে বিস্তীর্ণ খোলা মাঠটি রমনা নামে পরিচিত ছিল। উনিশ শতকের প্রথম দিকে সুজাতপুর এলাকায় আর্মেনীয় ভূস্বামী আরাতুন এবং ব্রিটিশ বিচারক গ্রিফিন কুক দুটি বাগানবাড়ি তৈরি করেছিলেন। এই শতকের চল্লিশের দশকে নওয়াব খাজা আব্দুল গণির পিতা খাজা আলিমুল্লাহ ঐ বাগানবাড়ি দুটি কিনে নেন।


১৮৬৮ সালে নওয়াব আবদুল গণি জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব পুত্র খাজা আহসানুল্লাহ কে প্রদান করেন। আবদুল গণি অবসর কাটাতে মনের মত একটি বাগানবাড়ি তৈরি করতে মনস্থ করেন। ১৮৭০-৭১ সালে তিনি বর্তমান কলাভবন এলাকাটি নুরুদ্দিন হোসেনের ছেলের নিকট ক্রয় করেন। ১৮৭৬-০৭ সালে এর উত্তরাংশ কেনা হয়। শাহবাগে মোট জমির পরিমাণ ছিল প্রায় দুশ বিঘা। ১৮৭৩ সালে শাহবাগ বাগানবাড়ির নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং তা শেষ হতে বেশ কয়েক বছর লেগে যায়। মুগলদের বিলাসবহুল বাগ-এ-বাদশাহির অনুকরণে নওয়াব আবদুল গণি এর নামকরণ করেছিলেন শাহবাগ। এর উত্তর পাশেই নওয়াব খাজা সলিমুল্লাহ র আমলে গড়ে ওঠে পরীবাগ বাগানবাড়ি।

বাগানবাড়িটির চারদিকে দেয়াল দ্বারা সুরক্ষিত করা হয়েছিল। এর মাঝে বেশ কয়েকটি প্রাসাদোপম অট্টালিকা, মার্বেল পাথরে বাঁধানো বৈঠকখানা এবং অনেকগুলো বাঁধানো চত্বর ছিল। এখানে আঁকাবাঁকা সরু লেকগুলির দৈর্ঘ ছিল কয়েক কিলোমিটার। আরও ছিল অনেকগুলি বৃহদাকার প্রাকৃতিক ও বাঁধানো সরোবর। কোন কোন সরোবরের মধ্যখানে ছিল দ্বীপকারে নির্মিত গোল চত্বর ও চন্দ্রাতপ এবং সেগুলিতে যাতায়াতের জন্য ছিল সেতু। এখানে নানা রঙের বাহারি মাছসহ অনেকগুলি চৌবাচ্চা এবং নানা ধরনের ফোয়ারা ছিল। রঙবেরঙের গাছ-গাছালি এবং দেশি বিদেশি ফুল-ফলের গাছে পুরো বাগানটি ছিল সাজানো। বাগানটি সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তৎকালের দুই বিখ্যাত কবি উবায়দুল্লাহ সোহরাওয়ারদী ও আবদুল গফুর নাসসাখ কবিতা রচনা করেছিলেন।

শাহবাগে ইশরাত মঞ্জিল নামে দ্বিতল ভবনটি ছিল সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয়। ১৯০৬ সালে শাহবাগে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সমিতির অধিবেশনে আগত অথিতিদের এখানে স্বাগত জানানো হয়। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন এলাকায় মধুর ক্যান্টিন নামে পরিচিত ভবনটি ছিল এ বাগানবাড়ির জলসাঘর। ভবনটির মেঝে ও চতুর্দিকের প্রশস্ত অঙ্গন ছিল মার্বেল পাথরে বাঁধানো। এখানে নওয়াব পরিবারের লোকেরা স্কেটিং অনুশীলন করতেন বলে ভবনটিকে স্কেটিং প্যাভিলিয়ন ও বলা হত। এই ভবনটির দুটি গোলাকার কক্ষ আজও টিকে আছে। ১৯০৬ সালে উপরিউক্ত অধিবেশনটি এই ভবন প্রাঙ্গনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শাহবাগে নিশাত মঞ্জিল নামে আরেকটি দ্বিতল ভবনে দুর্লভ বস্তুর একটি পারিবারিক জাদুঘর ছিল। বর্তমান কাঁটাবন মসজিদের দক্ষিণ পার্শে বৃত্তাকারে নির্মিত আস্তাবলটিও (বর্তমান বিলুপ্ত) শাহবাগ বাগানবাড়ির অংশ ছিল। নওয়াবদের ঘোড়া ছাড়াও ঘোড়াদৌড়ের সময় ঢাকায় আগত প্রতিযোগীদের ঘোড়াও সেখানে রাখা হত। শাহবাগের পূর্ব পাশে অবস্থিত রেসকোর্স ময়দানটিও ঢাকার নওয়াবদের মালিকানায় ছিল। ঘোড়াদৌড়ের সময় আগত ইংরেজ সাহেব-মেমদের জন্য শাহবাগ বাগানবাড়িতে ভোজসভা ও বল নাচের আয়োজন করা হত। শাহবাগে নওয়াব সাহেব একটি চিড়িয়াখানাও স্থাপন করেছিলেন। ১৮৭৫ সাল থেকে প্রতি বছর খ্রিষ্টীয় নববর্ষ উপলক্ষে শাহবাগে কৃষিজ ও দেশীয় শিল্পজাত দ্রব্যের মেলা অনুষ্ঠিত হত। উক্ত মেলায় প্রদর্শিত শ্রেষ্ঠজাতের পশু-পাখি ও কৃষিজাত দ্রব্যের জন্য নওয়াবের পক্ষ থেকে পুরস্কার দেওয়া হতো। মেলা উপলক্ষে শাহবাগ সুন্দরভাবে সাজানো হত। নওয়াবের ব্যয়ে সেখানে নর্তক-নর্তকী, গায়ক-গায়িকারা নাচগান করে দর্শকদের মনোরঞ্জন করত। যাত্রা, পুতুল নাচ, ম্যাজিক, বায়স্কোপেরও ব্যবস্থা থাকত। মেলার সময় ব্যতীত বাগানটিতে সাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল না। তবে অনুমতি নিয়ে চিড়িয়াখানা দেখার জন্য প্রবেশ করা যেত। ১৯২১ সাল থেকে নওয়াবজাদির পরীবানু ঢাকার সম্ভ্রান্ত মহিলাদের বেড়ানোর জন্য প্রতি শনিবার বাগানটি খুলে রাখার ব্যবস্থা করেন। ১৯০১ সালে নওয়াব আহসানুল্লাহর ব্যয়ে ঢাকা শহরে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলেও শাহবাগে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সেখানে বিদ্যুতায়নের জন্য আগে থেকেই পৃথক জেনারেটর ছিল।
উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের প্রথমভাগ জুড়ে শাহবাগ ছিল ঢাকার উচ্চ পর্যায়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রভুমি। ঢাকার নওয়াবদের পারিবারিক অনুষ্ঠানাদি ছাড়াও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ঢাকায় আগমন কিংবা বিদায় উপলক্ষে এখানে ঘটা করে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান করা হত। ১৮৮৮ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গের ছোটলাট বেইলিকে এবং ২৬ জুলাই বড়লাট লর্ড ডাফরিনকে শাহবাগে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ১৮৯১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ও ১৮৯৪ সালের ২০ জুলাই বঙ্গের ছোটলাট চার্লস ইলিয়ট কে এবং ১৯০২ সালের ২১ জুলাই ছোটলাট উডবার্নকে সংবর্ধনা দেওয়ার জন্য শাহবাগে অনুষ্ঠান করা হয়। নওয়াব সেলিমুল্লাহর উদ্যোগে ১৯০৬ সালের ১৪ ও ১৫ এপ্রিল শাহবাগে এই অঞ্চলের পাঁচ হাজার মুসলমানের এক সভায় পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতি গঠিত হয়। ঐ বছরই নওয়াব সাহেবের উদ্যোগে শাহবাগে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সমিতির অধিবেশনে ৩০ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ এর জন্ম হয়। ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি নওয়াব সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গের মুসলিম প্রতিনিধিদল শাহবাগেই বড়লাট হার্ডিঞ্জ এর সঙ্গে সাক্ষাত করেন এবং বড়লাট তাদের কাছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করেন।

১৯১৫ সালে নওয়াব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র নওয়াব খাজা হাবিবুল্লাহর অব্যবস্থাপনার দরুন ঢাকার নওয়াবদের জমিদারির ন্যায় শাহবাগেরও জৌলুস কমতে থাকে। পারিবারিক কোন্দলের দরুন ক্রমে সেটা অংশীদারদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে যায়। তবুও বিশ শতকের চল্লিশের দশকে প্রারম্ভ পর্যন্ত শাহবাগের মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি হতো।


for English Version

No comments:

Post a Comment