Social Icons

Join Our Facebook Fan Page

বাঙালী

বাঙ্গালীর পূর্ব ইতিহাস



প্রাচীন যুগ তথ্যের স্বল্পতার কারণে মুসলিম-পূর্ব যুগের বাংলার ইতিহাস পুনর্গঠন দুরূহ। এ অসুবিধা বেশী করে অনুভূত হয় প্রাচীনকালের ইতিহাস রচনায়, অর্থাৎ প্রাচীনতম কাল থেকে খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীতে বাংলায় গুপ্ত শাসন প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত। এ যুগের ইতিহাসের উপাদানের জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় বৈদিক, মাহাকাব্যিক ও পৌরাণিক সাহিত্যের অপ্রতুল তথ্য এবং প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনাদির ওপর। গুপ্তযুগ থেকে পরবর্তী সময়ে আমরা লিপি ও সাহিত্যাকারে লিখিত তথ্য পাই। এসব লিপি ও সাহিত্য-কর্মে রয়েছে বাংলা ইতিহাসের উপাদান।
পটভূমিঃ সর্বপ্রাচীন যুগে বাংলায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বসবাস ছিল বলে জানা যায়। যে অঞ্চলে যে জনগোষ্ঠী বাস করত সে অঞ্চলের সঙ্গে সেই বিশেষ জনগোষ্ঠীর নাম সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। এভাবে বঙ্গ, পুণ্ড্র, রাঢ় ও গৌড় নামক প্রাচীন জনপদসমূহ এ সব নামের অনার্য জনগোষ্ঠীর দ্বারা অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃত হয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে মেঘনার ওপারে সমতট (কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চল) ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ জনপদ। এ জনপদের নাম পুরোপুরি বর্ণনাত্বক এবং জনগোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা বর্জিত। চট্টগ্রাম ও তৎসন্নিহিত অঞ্চল হরিকেল নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তী বৈদিক সাহিত্য থেকে অনার্য জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে এ সকল জনপদের কথা জানা যায়। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মধ্যভাগে প্রাচীন ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আর্য-প্রভাব অনুভব হয়। উপমহাদেশের পূর্বপ্রান্তে পৌছাতে আর্যদের আরও বেশী সময় লাগে। তাই বাংলার অধিবাসীগণ আর্যায়নের স্রোতধারা বেশ দেরিতেই উপলব্ধি করে। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী থেকে পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে বাংলায় আর্যদের অনুপ্রবেশ ঘটে এবং সমগ্র বাংলাকে আর্যায়িত করতে তাদের প্রায় এক হাজার বছর লেগে যায়। উত্তর ভারতে এ দীর্ঘ যাত্রাকালে আর্য-প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল। ততদিনে বাংলার অধিবাসীদের সংস্কৃতিতে অনার্য উপাদান দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় পায় এবং আর্য-প্রভাব স্বত্বেও আর্য-পূর্ব জীবন বৈশিষ্টের অনেক উপাদানই বজায় থাকে।
পাথরের তৈরি যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ারই হচ্ছে মানব বসতির সর্বপ্রাচীন নিদর্শন। পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর, বাঁকুড়া ও বর্ধমান জেলায় প্রাগৈতিহাসিক যুগের পাথরের তৈরি যন্ত্রপাতি ও হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়েছে। এ হাতিয়ার ব্যবহারকারী জনগোষ্ঠী কখন প্রথম বাংলায় বসতি স্থাপন করেছিল তা যথার্থভাবে, এমনকি অনুমানেও নির্ধারণ করা কঠিন। এটা সম্ভবত ঘটেছিল দশ হাজার বছর (বা তারও) আগে। নিষাদ বা অস্ত্রিক কিংবা অস্ত্রো-এশিয় গোষ্ঠীর অনার্য লোকেরাই এতদঞ্চলের আদি বাসিন্দা। আজকের কোল, ভিল, সাঁওতাল, শবর, পুলিন্দ প্রভৃতি আদিম অধিবাসীরা তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে। পরবর্তীকালে দ্রাবিড় ও তিব্বত-বর্মি ভাষাভাষী আরও দুটি জাতি বাংলায় বসতি স্থাপন করে।
১৯৬০ এর দশকে প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার থেকে প্রমাণিত হয় যে, বাংলার কোথাও কোথাও খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দের শুরুতে, সম্ভবত তারও আগে, অপেক্ষাকৃত অনেক উন্নত এক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। অজয় নদের উপত্যকায় বর্ধমান জেলার পাণ্ডু রাজার ঢিবি (বোলপুরের সন্নিকটে) এবং অজয়, কুনার ও কোপাই নদীর তীরবর্তী অন্যান্য প্রত্ন এলাকায় প্রাপ্ত নিদর্শনাদি বাংলার প্রাগৈতিহাসিক যুগ সম্পর্কে নতুন ধারণার জন্ম দিয়েছে।
পাণ্ডু রাজার ঢিবি একটি বাণিজ্যিক শহরের ধ্বংসাবিশেষ। ভারতের অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের সঙ্গে শুধু নয়, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের দেশসমূহের সঙ্গেও এর বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। বৈদিক সাহিত্য থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায় যে, আর্যরা বাংলার আদি অধিবাসীদের বর্বর মনে করত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যে উন্নত বস্তুগত সংস্কৃতির সন্ধান পাওয়া গেছে তা নিঃসন্দেহে আর্য-মনোভাবের অসারতা প্রমাণ করে। অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে আর্যস্থাপন গভীরভাবে বাংলার সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে। ক্রমান্বয়ে আর্যায়ন প্রক্রিয়া এতদঞ্চলের পরবর্তী ইতিহাসের মূল প্রতিপাদ্য। খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দী থেকে বাংলার ইতিহাস আমাদের নিকট মোটামুটি স্পষ্টভাবেই প্রতিভাত হয়। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এ ইতিহাস আর্য প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস।
গ্রীক ও ল্যাটিন উৎস থেকে (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয় ১ম শতাব্দী) গঙ্গারিডি (গ্রীক) বা গঙ্গারিডাই (ল্যাটিন) নামক পূর্ব ভারতের একটি শক্তিশালী রাজ্যের কথা কানা যায়। এ রাজ্য সামরিক দিক থেকে খুবই শক্তিশালী ছিল। পণ্ডিতগণ বাংলার দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে গঙ্গার (ভাগীরথী ও পদ্মার) মোহনার কাছে গঙ্গারিডাই-র অবস্থান নির্দেশ করেন।
বগুড়া জেলার মহাস্থানগড় এর ধ্বংসাবশেষ প্রাচীন পুণ্ড্রনগর হিসেবে চিহ্নিত। খনন কাজের ফলে এখানে ব্রাক্ষি হরফে লেখা একটি ক্ষোদিত লিপি পাওয়া গেছে। এ লিপি বাংলার অংশ বিশেষের উপর মৌর্য শাসনের (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী) প্রমাণ বহন করে। বাংলায় প্রাপ্ত প্রাচীনতম এ লিপি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পুণ্ড্রনগর বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়ের সাথে অভিন্ন। বাংলার প্রাচীনতম নগরজীবনের নিদর্শন হচ্ছে এ পুণ্ড্রনগর। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত এ শহরটির অস্তিত্ব ছিল। কৈটিল্যের অর্থশাস্ত্রে (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতাব্দী) উল্লেখ আছে যে, বঙ্গের (দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা) মিহি সূতিবস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হিসেবে সারা ভারতে রপ্তানি হতো। গ্রীক ও ল্যাটিন লেখকগণও (মোটামুটি একই সময়ে) এর উল্লেখ করেছেন। সুতরাং একথা জোরে দিয়েই বলা যায় যে, বাংলায় মিহি বস্ত্র তৈরির ঐতিহ্য সুপ্রাচীন। দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার এ পণ্যটিই ষোড়শ ও শতাব্দীতে বাংলার মসলিন এবং আরও সুনির্দিষ্ট করে ঢাকাই মসলিন হিসেবে বিশ্বজোড়া খ্যাতিলাভ করে। এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখযোগ্য যে, পোড়ামাটির ফলকসমূহ বাংলার এ শিল্পের প্রাচীনত্বের প্রমাণ দেয়। গুপ্তশাসন খ্রিষ্টপূর্ব ২য় শতাব্দীতে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন থেকে খ্রিষ্টীয় ৪র্থ শতাব্দীতে গুপ্ত সাম্রাজ্যের উত্থান পর্যন্ত সময়ের বাংলার ইতিহাস অস্পষ্ট। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় বা প্রথম শতাব্দীর কতগুলি সুদৃশ্য পোড়ামাটির মূর্তি মহাস্থান, তাম্রলিপি ও চন্দ্রকেতুগড়ে আবিষ্কৃত হয়েছে। এ আবিষ্কার প্রমাণ করে যে, শুঙ্গ ও কুষাণ আমলে বাংলার শ্রীবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। দি পেরিপ্লাস অব দি ইরিথ্রিয়ান সি ও টলেমীর বর্ণনা থেকে অনুমতি হয় যে, খ্রিষ্টীয় প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীতে বাংলার সমগ্র বদ্বীপ অঞ্চলে একটি শক্তিশালী রাজ্য গড়ে উঠেছিল। গঙ্গা নদীর তীরবর্তী বিখ্যাত ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। মিলিন্দ-পনহো প্রদত্ত সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশসমূহের তালিকায় বঙ্গের উল্লেখ রয়েছে যে খানে অসংখ্য বাণিজ্যিক জাহাজ জড় হতো।


চলবে...

No comments:

Post a Comment