অপরাজেয় তারুণ্য
আমার জীবনকালে আমি চারটি তাৎপর্যপূর্ণ গণজাগরণ দেখেছি। প্রথমটি বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, এরপর উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, এরপর নব্বইয়ের এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও সবশেষে শাহবাগ চত্বরের আজকের গণজাগরণ। আগের প্রতিটি আন্দোলনেরই মূল চালিকাশক্তি ছিল তরুণেরা। তারা এসবের জন্য সংগ্রাম করেছে, রক্ত দিয়েছে এবং একসময় ইতিবাচক দিকে জাতীয় ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তরুণসুলভভাবেই তারা সব সময় যুক্তি বা চিন্তার ভাষাকে মানেনি। যৌবনের জন্মান্ধ প্রেরণায় সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব, ভয়, নিষেধ হাওয়ায় উড়িয়ে ঘূর্ণির মতো ছুটে গেছে ইপ্সিত স্বপ্নের পেছনে। আর এরই পরের এক অবিশ্বাস্য ভোরে সে স্বপ্নের কাঙ্ক্ষিত ফসল উপহার দিয়েছে জাতিকে। এ জন্য যৌবনের অন্ধ দুর্বার শক্তির ওপর চিরদিনই আমি আস্থাশীল ও তারাই আমার আজীবনের স্বপ্ন ও গন্তব্য।
অতীতে প্রতিবারই তরুণদের জেগে ওঠার পেছনে কাজ করেছে কোনো না-কোনো জাতীয় উৎকণ্ঠা। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সময় কাজ করেছে মাতৃভাষার নিশ্চিহ্ন হওয়ার উৎকণ্ঠা। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় স্বাধিকার হারানোর আতঙ্ক। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় গণতন্ত্র হারানোর ভয়। এবারের শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনের সূচনাতে তাই স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন এসেছে, এবার তরুণদের মনের মূল উৎকণ্ঠাটি কী। আমার মনে হয়েছে ব্যাপারটা কিছুটা এ রকম: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় সারা জাতির ওপর এক নারকীয় নিগ্রহের তাণ্ডব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল লাখ লাখ মানুষ। উদ্বাস্তু জীবন যাপন করতে হয়েছিল সারা দেশের প্রতিটি মানুষকে। সে অমানবিক অপরাধের বিচার জাতি পায়নি। একটি পুরো প্রজন্ম পার হলেও জাতির ভেতর সে ক্ষোভের আগুন আজও জ্বলছে। জাতির অতৃপ্ত আত্মা আজও সেই ক্ষমাহীন অপরাধের প্রতিশোধ খুঁজে বেড়ায়। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। বিচারের একপর্যায়ে হঠাৎ করেই আশান্বিত তরুণেরা আতঙ্কের সঙ্গে অনুভব করেছে যথার্থ বিচার জাতি হয়তো এবারও পাবে না। অতীতে বারবার ব্যর্থ হয়ে সবকিছু নিয়ে সন্দিহান আর উৎকণ্ঠিত হয়ে উঠেছে তারা। প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নেমেছে। তারা জানে, দেশে কিছু রাজনৈতিক দল আছে, যাদের কাছ থেকে কোনো দিনই তারা এ বিচার পাবে না। তাদের আতঙ্ক জেগেছে, যারা বিচার করতে চায় তারাও পেছনের দরজা দিয়ে কোনো আপস করে ফেলল কি না। বিচার বিভাগের ওপরও যেন তারা আস্থাহীন। এই আস্থাহীনতার আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা তাদের ঠেলে দিয়েছে মরিয়া প্রতিরোধের দিকে। তারা আজ অপ্রতিরোধ্য। তারা আজ যা চায় তার নাম বিচার। নিরপেক্ষ নিরঙ্কুশ বিচার। এ আজ তাদের আত্মার দাবি। অস্তিত্বের চিৎকার।
আমি কাজ করি নিভৃতে। জনসমাবেশ আমার সহজাত মঞ্চ নয়। শরীরটা ভালো নেই, কিন্তু পত্র-পত্রিকা আর টেলিভিশনের পর্দায় সে প্রতিবাদের রূপ আমি দেখেছি। আমার চোখের পাতা ভিজে উঠেছে। কেবলই মনে হয়েছে আবহমানের বাংলা এখনো জেগে আছে।
বহুদিন হলো রাজনৈতিক দস্যুতা, নৈরাজ্য, সন্ত্রাস আর অবিচারের মুখে সারা জাতি পিছু হটতে হটতে প্রায় গর্তের ভেতরে ঢুকে গেছে। তরুণ সম্প্রদায়ও হতাশায়, নিষ্ক্রিয়তায়, অভিমানে দেশের বাস্তবতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজস্ব বিবরের মধ্যে অনেকটাই যেন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিল। শাহবাগের এই আন্দোলন আবার তাদের দেশপ্রেম ও দেশের বাস্তবতার সঙ্গে একাত্ম করে দিয়েছে। সেদিক থেকে এই ঘটনাকে আমাদের তরুণ প্রজন্মের ‘স্বদেশ প্রত্যাবর্তন’ বলেই আমার কাছে মনে হয়।
যুদ্ধাপরাধের দাবিতে উন্মাতাল শাহবাগ কোনো জঙ্গি চত্বর নয়। সেখান থেকে কোনো সশস্ত্র বা ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনাও জন্ম নেয়নি। এটা নেহাত এক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। তবু সেই চত্বরের অন্যতম প্রতিবাদী তরুণ রাজীবকে এরই মধ্যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমার সমবয়সী অনেকের মতো আমিও তাঁর মৃত্যুতে সন্তান হারানোর বেদনা অনুভব করেছি। সারা জাতিও তাঁর মৃত্যুতে স্তব্ধ, শোকাহত। এ ধরনের হত্যাকাণ্ড দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে দেওয়ারই শামিল। সবার সঙ্গে আমিও এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই এবং তরুণ প্রজন্মকে বুদ্ধি, সতর্কতা ও মেধাবী নেতৃত্ব দিয়ে সব বৈরিতা মোকাবিলার অনুরোধ করি।
যে ন্যায়সংগত দাবি নিয়ে শাহবাগ সোচ্চার হয়েছে, আমি বিশ্বাস করি, এ দেশ তার বাস্তব রূপ অচিরেই দেখবে। কারণ, জনগণের কণ্ঠস্বর ন্যায়-নীতি, আইন, বিচার, রাজনীতি, সংসদ, সংবিধান—সবকিছুর ওপরে।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: শিক্ষাবিদ।
No comments:
Post a Comment